
শিশুর টিকার তালিকা ও সময়সূচি সবচেয়ে নির্ভুলভাবে পাবেন আপনার শিশুর ইপিআই টিকা কার্ডে আর নিকটস্থ সরকারি টিকাদান কেন্দ্রে। বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকা জন্মের পর থেকেই শুরু হয়, প্রথম বছরে কয়েক দফায় দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় বছরের শুরুতেও ডোজ থাকে। প্রতিটি টিকা ঠিক বয়সে দিলে তবেই শিশু পুরো সুরক্ষা পায় (WHO)।
অনেক মা-বাবা অনলাইনে টিকার চার্ট খোঁজেন। কিন্তু সরকার মাঝে মাঝে নতুন টিকা যোগ করে বা সূচিতে পরিবর্তন আনে, তাই পুরোনো কোনো ছবি বা পোস্ট দেখে তারিখ ঠিক করা ঝুঁকিপূর্ণ। এই লেখায় তাই নির্দিষ্ট চার্ট না দিয়ে বলছি কীভাবে সঠিক সূচি জানবেন, একটাও ডোজ মিস করবেন না, আর টিকার দিনটা কীভাবে সহজ করবেন।
শিশুর টিকার তালিকা কোথায় পাবেন
বাংলাদেশে ইপিআই এর টিকাগুলো সরকারি কেন্দ্রে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। সঠিক তথ্যের উৎসগুলো হলো:
- টিকা কার্ড: প্রথম টিকার দিনই কার্ড দেওয়া হয়। এতে কোন টিকা কবে দেওয়া হলো আর পরেরটা কবে, তা লেখা থাকে।
- টিকাদান কর্মী ও স্বাস্থ্য সহকারী: গ্রামে ও শহরের ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট দিনে আউটরিচ সেন্টার বসে। তারা পরের তারিখ বলে দেন।
- উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, সিটি কর্পোরেশনের টিকা কেন্দ্র এবং সরকারি হাসপাতাল।
WHO এর ভাষায়, বেশিরভাগ দেশে টিকা কার্ডেই লেখা থাকে কোন টিকা দেওয়া হয়েছে আর পরের ডোজ কবে। তাই এই কার্ডটাই আপনার আসল চার্ট।
ইপিআই সূচি নিয়ে যা জানা দরকার
সাধারণভাবে বাংলাদেশের শিশু টিকাগুলো কয়েকটি ধাপে আসে:
- জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব প্রথম টিকা।
- জীবনের প্রথম কয়েক মাসে কয়েক সপ্তাহ পর পর একাধিক দফা।
- প্রথম জন্মদিনের আগে আরেক দফা।
- দ্বিতীয় বছরের শুরুর দিকে আরও এক দফা।
প্রতিটি দফায় কোন কোন টিকা দেওয়া হবে, সেটা টিকা কার্ড আর কেন্দ্রের কর্মী বলে দেবেন। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন টিকাও কর্মসূচিতে যোগ হয়েছে, তাই আগের সন্তানের কার্ডের সঙ্গে ছোটটির কার্ড না মিলিয়ে নতুন নির্দেশনা জেনে নিন।
একটা কথা মাথায় রাখুন: টিকা দেরিতে দিলে সেই সময়টুকু শিশু অসুখের ঝুঁকিতে থাকে (WHO)। কোনো ডোজ বাদ পড়লে ভয় পাবেন না, স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলে বাকিটা পূরণ করে নিন (WHO)। বেসরকারি হাসপাতালে কিছু বাড়তি টিকার কথাও শুনবেন। সেগুলো দেবেন কি না, শিশুর ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন, তবে সরকারি সূচির টিকা যেন বাদ না পড়ে।
টিকার কার্ড যত্নে রাখার উপায়
- কার্ডের দুই পাশের ছবি তুলে মোবাইলে ও পরিবারের কারও হোয়াটসঅ্যাপে রেখে দিন।
- বর্ষায় কাগজ ভিজে নষ্ট হতে পারে, তাই একটা জিপ ব্যাগে রাখুন।
- পরের তারিখটা মোবাইল ক্যালেন্ডারে এক দিন আগের রিমাইন্ডারসহ লিখে রাখুন।
- স্কুলে ভর্তি বা বিদেশ যাত্রায় এই কার্ড লাগতে পারে, তাই হারাবেন না।
টিকার দিনের প্রস্তুতি
টিকার দিনটা শিশুর জন্য একটু কষ্টের, কিন্তু কিছু প্রস্তুতি নিলে অনেক সহজ হয়ে যায়।
- আগের রাতে ব্যাগ গুছিয়ে নিন: টিকা কার্ড, জন্মনিবন্ধনের কপি, ডায়াপার, এক সেট বাড়তি জামা, পাতলা কাঁথা। আমাদের মাদার ব্যাগ / ডায়াপার ব্যাকপ্যাক এ সব এক জায়গায় রাখা যায়। কী কী নেবেন তার পূর্ণ তালিকা আছে আমাদের মাদার ব্যাগ চেকলিস্টে।
- ঢিলেঢালা জামা পরান: উরু বা বাহু সহজে খোলা যায় এমন জামা।
- সকালের দিকে যান: কেন্দ্রে ভিড় কম থাকে, গরমও কম।
- হাত পরিষ্কারের জন্য Fresh Happy Nappy বেবি ওয়াইপস সঙ্গে রাখুন।
- প্রিয় জিনিস সঙ্গে নিন: পরিচিত কাঁথা, খেলনা বা বই শিশুকে শান্ত রাখে (CDC)। যেমন আমাদের ধোয়া যায় এমন কাপড়ের বই – পশুপাখি অপেক্ষার সময় মন ভোলাতে পারে।
টিকা দেওয়ার সময় ও পরে শিশুকে শান্ত রাখা
CDC কয়েকটি সহজ পরামর্শ দেয়:
- শিশুকে কোলে শক্ত করে ধরে রাখুন, চোখে চোখ রেখে নরম গলায় কথা বলুন বা গান গান।
- টিকার পরপরই বুকের দুধ খাওয়ালে বা ত্বকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে জড়িয়ে ধরলে শিশু দ্রুত শান্ত হয়।
- ইনজেকশনের জায়গা লাল হলে বা ফুলে গেলে ঠান্ডা ভেজা পরিষ্কার কাপড় আলতো করে রাখতে পারেন।
- হালকা জ্বর, ব্যথা বা খিটখিটে ভাব সাধারণত অল্প সময়েই সেরে যায়। প্রথম দিন খেতে কম চাইলে বারবার দুধ দিন।
- কোনো ওষুধ দেওয়ার দরকার মনে হলে আগে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করুন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
টিকার পরের কয়েক দিন শিশুকে খেয়াল করুন। নিচের কোনোটি হলে দ্রুত ডাক্তার দেখান:
- শ্বাসকষ্ট, মুখ বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া, সারা গায়ে র্যাশ (এগুলো হলে সোজা হাসপাতালে যান)
- খিঁচুনি বা শিশু খুব নিস্তেজ হয়ে পড়া
- টানা অনেকক্ষণ থামানো যায় না এমন কান্না
- জ্বর বাড়তে থাকা বা দুই দিনের বেশি থাকা
- ৩ মাসের কম শিশুর ৩৮°C বা বেশি জ্বর
সাধারণ প্রশ্ন
শিশুর টিকা কি বিনামূল্যে পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, ইপিআই এর আওতাভুক্ত টিকাগুলো সরকারি টিকাদান কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কোন কেন্দ্রে কবে টিকা দেওয়া হয়, তা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে জেনে নিন।
টিকার তারিখ পার হয়ে গেলে কী করব?
নতুন করে শুরু করার দরকার সাধারণত হয় না। যত দ্রুত সম্ভব টিকা কার্ড নিয়ে কেন্দ্রে যান, স্বাস্থ্যকর্মী বাকি ডোজ কীভাবে দেবেন তা ঠিক করে দেবেন।
সর্দি বা হালকা জ্বর থাকলে কি টিকা দেওয়া যাবে?
অনেক ক্ষেত্রে হালকা সর্দি থাকলেও টিকা দেওয়া যায়, তবে সিদ্ধান্তটা টিকাদান কর্মী বা ডাক্তার নেবেন। কেন্দ্রে গিয়ে শিশুর অসুস্থতার কথা খুলে বলুন।
টিকার দিনে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে দেখুন আমাদের বেবি কেয়ার কালেকশন।
