
শিশু যেদিন প্রথম হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসে, সেদিন পুরো পরিবারের আনন্দের শেষ থাকে না। কিন্তু এর পরপরই মা-বাবা টের পান, ঘরের প্রতিটি কোণ এখন শিশুর নাগালে। তাই হামাগুড়ি দেওয়া শিশুর জন্য ঘর নিরাপদ রাখার কাজটা শিশু হামাগুড়ি শুরুর আগেই সেরে ফেলা ভালো।
এই লেখায় যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) এর পরামর্শের সঙ্গে আমাদের দেশের ফ্ল্যাট বাড়ি, টাইলসের মেঝে আর যৌথ পরিবারের বাস্তবতা মিলিয়ে একটা ঘরভিত্তিক চেকলিস্ট দিচ্ছি। শিশুর হাঁটা শেখার সময় মাথার সুরক্ষা নিয়ে আলাদা আলোচনা পাবেন আমাদের মাথার সুরক্ষা হেলমেট লেখায়।
হামাগুড়ি দেওয়া শিশুর জন্য ঘর নিরাপদ করার প্রথম ধাপ
একটা সহজ কাজ দিয়ে শুরু করুন। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পুরো ঘর একবার ঘুরে দেখুন। শিশু যা দেখবে, আপনিও তা-ই দেখবেন: খাটের নিচে পড়ে থাকা কয়েন, ঝুলে থাকা চার্জারের তার, নিচের তাকে রাখা ওষুধ।
এই এক চক্করেই অনেক বিপদ চোখে পড়ে, যেগুলো দাঁড়িয়ে থাকলে খেয়ালই হয় না। কাজটা মাসে অন্তত একবার করুন, কারণ শিশু যত বড় হবে, তার নাগালও তত বাড়বে।
মেঝে: টাইলস, পিচ্ছিল জায়গা আর হাঁটু
আমাদের বেশিরভাগ ফ্ল্যাটে টাইলস বা মোজাইকের মেঝে। এই শক্ত ও ঠান্ডা মেঝেতে বারবার হামাগুড়ি দিলে শিশুর হাঁটু লাল হয়ে যেতে পারে, আর ভেজা জায়গায় হাত পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে।
- মোছার পর মেঝে পুরো শুকিয়ে তবেই শিশুকে নামান।
- শিশুর খেলার জন্য একটা নির্দিষ্ট নরম জায়গা ঠিক করুন, যেমন মাদুর বা খেলার ম্যাট। আমাদের ৫-ইন-১ বেবি পিয়ানো প্লে জিম ম্যাট দিয়ে এমন একটা খেলার কোণ বানানো যায়।
- শক্ত মেঝেতে হামাগুড়ির সময় হাঁটু ঢেকে রাখতে আমাদের অ্যান্টি-স্লিপ বেবি নি প্যাড ব্যবহার করতে পারেন।
- মেঝেতে পড়ে থাকা ছোট জিনিস প্রতিদিন একবার ঝাড়ু দিয়ে তুলে ফেলুন।
ছোট জিনিস: গলায় আটকানোর ঝুঁকি
হামাগুড়ির বয়সে শিশু যা পায় তা-ই মুখে দেয়। NHS বোতাম, কয়েন আর খেলনার ছোট অংশ শিশুর নাগালের বাইরে রাখতে বলে, আর বড় ভাইবোনের খেলনাও আলাদা রাখতে বলে (NHS)।
যৌথ পরিবারে বড় শিশুদের লেগো, মার্বেল বা পুঁতির খেলনা প্রায়ই মেঝেতে পড়ে থাকে। তাদের খেলনার জন্য আলাদা বাক্স আর আলাদা ঘর ঠিক করে দিন।
বোতাম ব্যাটারি নিয়ে বিশেষ সাবধান থাকুন। রিমোট, ঘড়ি, খেলনা বা ক্যালকুলেটরে থাকা এই ছোট গোল ব্যাটারি গিলে ফেললে শরীরের ভেতরে মারাত্মক পোড়া হতে পারে (NHS)। ব্যাটারির ঢাকনা স্ক্রু দিয়ে আটকানো আছে কি না দেখুন, আর পুরনো ব্যাটারি সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিন।
তার, দড়ি আর বৈদ্যুতিক জিনিস
- মোবাইল চার্জার, রাউটার ও টেবিল ফ্যানের তার মেঝে থেকে তুলে দেয়ালের সঙ্গে আটকে দিন।
- পর্দার দড়ি বা ঝুলন্ত তার বেঁধে নাগালের বাইরে রাখুন; কোনো দড়ি মেঝেতে ফেলে রাখবেন না (NHS)।
- একটা সকেটে অনেকগুলো প্লাগ লাগিয়ে চাপ দেবেন না (NHS)।
- আইপিএস বা ইনভার্টারের ব্যাটারি থাকলে তার চারপাশ ঘিরে দিন, যাতে শিশু কাছে যেতে না পারে।
সিঁড়ি, জানালা ও বারান্দা
শিশু হামাগুড়ি শিখলেই সিঁড়ির দিকে টান অনুভব করে। NHS সিঁড়ির ওপরে ও নিচে গেট লাগাতে এবং প্রতিবার পার হওয়ার পর ঠিকভাবে বন্ধ করতে বলে (NHS)।
বারান্দা বা সিঁড়ির রেলিংয়ের ফাঁক ৬.৫ সেন্টিমিটারের বেশি হলে বোর্ড বা জাল দিয়ে ঢেকে দিন। নিচু আসবাব জানালা থেকে দূরে রাখুন, আর জানালায় এমন লক লাগান যাতে সেটা ৬.৫ সেন্টিমিটারের বেশি খুলতে না পারে (NHS)। ফ্ল্যাট বাড়ির গ্রিলবিহীন জানালা আর খোলা ছাদ তাই বড় দুশ্চিন্তার জায়গা।
রান্নাঘর, ওষুধ ও পরিষ্কারের জিনিস
- ওষুধ, টয়লেট ক্লিনার, ডিটারজেন্ট আর কীটনাশক তালা দেওয়া আলমারিতে বা উঁচু তাকে রাখুন (NHS)।
- বোতলের মুখ শক্ত করে বন্ধ রাখুন।
- গরম চা-কফির কাপ টেবিলের কিনারায় রাখবেন না।
- চুলার পেছনের বার্নার ব্যবহার করুন এবং হাঁড়ির হাতল ভেতরের দিকে ঘুরিয়ে রাখুন (NHS)।
- দেশলাই ও লাইটার নাগালের বাইরে রাখুন।
আসবাব ও উঁচু জায়গা
হামাগুড়ির পরের ধাপেই শিশু আসবাব ধরে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। তখন নড়বড়ে টেবিল, হালকা তাক বা টিভির স্ট্যান্ড টেনে নিজের গায়ে ফেলে দিতে পারে, তাই এগুলো দেয়ালের সঙ্গে শক্ত করে আটকে রাখুন।
NHS বাউন্সার বা কার সিটে শিশু থাকলে সেটা টেবিল বা উঁচু জায়গায় না রেখে মেঝেতে রাখতে বলে, কারণ নড়াচড়ায় উল্টে যেতে পারে (NHS)। খাটে শিশুকে একা রেখে উঠে যাবেন না; এই বয়সে কয়েক সেকেন্ডেই সে কিনারায় পৌঁছে যায়।
বাথরুম ও পানির বালতি
আমাদের বাসায় বাথরুমে পানি ভরা বালতি রাখা খুব সাধারণ। NHS জানাচ্ছে, মাত্র ৫ সেন্টিমিটার পানিতেও শিশু ডুবে যেতে পারে (NHS)। বাথরুমের দরজা বন্ধ রাখুন, বালতি ঢেকে রাখুন বা খালি করুন, আর গোসলের সময় শিশুকে এক মুহূর্তের জন্যও একা রাখবেন না।
কখন ডাক্তার দেখাবেন: শিশু কিছু গিলে ফেলেছে মনে হলে, বিশেষ করে ব্যাটারি, ওষুধ বা পরিষ্কারের রাসায়নিক, দেরি না করে হাসপাতালে নিন। উঁচু জায়গা থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পেলে, বারবার বমি করলে বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম দেখালেও সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখান।
সাধারণ প্রশ্ন
ঘর নিরাপদ করার কাজ কখন শুরু করব?
শিশু হামাগুড়ি শুরু করার আগেই, সাধারণত যখন সে গড়াগড়ি দিতে বা বসতে শেখে। একবারে সব না পারলে আগে সিঁড়ি, ছোট জিনিস আর ওষুধের দিকটা সামলান।
টাইলসের মেঝেতে হামাগুড়ি দিলে কি সমস্যা হয়?
শক্ত মেঝেতে বারবার ঘষায় হাঁটু লাল হতে পারে এবং ভেজা থাকলে পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে। মেঝে শুকনো রাখুন, খেলার জন্য নরম জায়গা ঠিক করুন এবং চাইলে নি প্যাড ব্যবহার করুন।
বাসায় বড় ভাইবোন থাকলে কী করব?
বড়দের ছোট খেলনা আলাদা বাক্সে বা আলাদা ঘরে রাখার নিয়ম করুন। তাদেরও সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিন কোন জিনিস ছোট ভাইবোনের মুখে গেলে বিপদ হতে পারে।
হামাগুড়ির বয়সের দরকারি জিনিস দেখুন আমাদের ০-১২ মাস সংগ্রহে।

2 Comments