
বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম হলো শিশুকে নিজের শরীরের একদম কাছে আনা, তার মাথা ও শরীর এক সরলরেখায় রাখা, আর এমনভাবে মুখে নিতে দেওয়া যাতে বোঁটার সঙ্গে চারপাশের কালো অংশেরও বড় একটা অংশ তার মুখে যায়। নবজাতক সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় ৮ থেকে ১২ বার খায়, তাই ঘড়ি ধরে নয়, শিশু চাইলেই খাওয়ান। দিনে অন্তত ছয়টি ভেজা ডায়াপার, খাওয়ার পর শান্ত ভাব আর নিয়মিত ওজন বাড়া বলে দেয় শিশু যথেষ্ট দুধ পাচ্ছে।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ অনেক মায়ের কাছেই কঠিন লাগে। বাড়িতে সবাই নানা পরামর্শ দেন, কেউ বলেন দুধ কম, কেউ বলেন পানি দাও। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় দেখব কীভাবে ঠিকমতো মুখে নেওয়াবেন, কোন পজিশনে আরাম, আর কীভাবে বুঝবেন সব ঠিকঠাক চলছে।
বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম: শুরুটা যেভাবে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা। প্রথম ছয় মাস শিশু শুধু মায়ের দুধ খাবে, অন্য কোনো খাবার বা পানীয় নয়, এমনকি পানিও নয় (WHO)।
শিশু দিনে বা রাতে যখনই চাইবে, তখনই খাওয়ান। ছয় মাস পর অন্য খাবার শুরু হলেও বুকের দুধ দুই বছর বা তার বেশি সময় চালিয়ে যাওয়া যায়।
আমাদের দেশে অনেক পরিবারে জন্মের পরপরই মধু, চিনির পানি বা মিছরি দেওয়ার রেওয়াজ আছে। এগুলো দেবেন না। শাশুড়ি বা মুরুব্বিদের নরম করে বুঝিয়ে বলুন যে প্রথম ছয় মাস মায়ের দুধই যথেষ্ট।
সঠিক লাচ: শিশু ঠিকমতো মুখে নিচ্ছে কি না
লাচ মানে শিশু কতটা ভালোভাবে স্তন মুখে নিয়েছে। লাচ ঠিক না হলে মায়ের বোঁটায় ব্যথা হয়, আর শিশুও কম দুধ পায়। এভাবে চেষ্টা করুন (NHS):
- আগে নিজে আরাম করে বসুন, দরকার হলে পিঠ ও হাতের নিচে বালিশ দিন।
- শিশুকে নিজের দিকে মুখ করে কাছে আনুন, তার নাক থাকবে বোঁটার সমান উচ্চতায়।
- মাথা সামান্য পেছনে হেলতে দিন, যাতে ওপরের ঠোঁট বোঁটা ছুঁয়ে যায় এবং শিশু বড় করে মুখ খোলে।
- মুখ বড় করে খুললে শিশুকে স্তনের দিকে আনুন, স্তন শিশুর মুখে ঠেলে দেবেন না।
- থুতনি আগে স্তন ছোঁবে, নাক থাকবে খোলা।
ভালো লাচের লক্ষণগুলো খেয়াল করুন:
- শিশুর মুখ বড় করে খোলা, নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে উল্টানো।
- থুতনি স্তনে লেগে আছে, নাক খোলা।
- নিচের ঠোঁটের চেয়ে ওপরের ঠোঁটের ওপরে কালো অংশ বেশি দেখা যায়।
- খাওয়ার সময় গাল গোল ও ভরা দেখায়, ভেতরে টেনে যায় না।
- মায়ের ব্যথা হয় না।
চারটি পরিচিত পজিশন
একেক মায়ের জন্য একেক পজিশন আরামদায়ক। কয়েকটা চেষ্টা করে দেখা একদম স্বাভাবিক (UNICEF)।
ক্র্যাডল হোল্ড
সবচেয়ে পরিচিত পজিশন। শিশুকে কোলে আড়াআড়ি রাখুন, তার মাথা থাকবে আপনার কনুইয়ের ভাঁজে, আর তার বুক থাকবে আপনার বুকের দিকে।
ক্রস-ক্র্যাডল হোল্ড
ক্র্যাডলের মতোই, তবে শিশুর মাথা কনুইয়ে না রেখে উল্টো হাতের তালুতে ধরেন। এতে শিশুর মাথা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়, তাই নবজাতক ও প্রথমবার মা হওয়াদের জন্য বেশ কাজের।
ফুটবল হোল্ড
শিশুকে বগলের নিচে পাশ দিয়ে ধরুন, তার পা থাকবে আপনার পিঠের দিকে। সিজারের পর পেটে চাপ এড়াতে, কিংবা স্তন ফুলে বা ব্যথা হলে এই পজিশন সুবিধাজনক।
পাশ ফিরে শুয়ে (সাইড-লায়িং)
আপনি পাশ ফিরে শোবেন, শিশুও আপনার দিকে মুখ করে শোবে। রাতে খাওয়ানোর সময় আরাম দেয়। শিশুর নাক যেন খোলা থাকে খেয়াল রাখুন, আর খাওয়া শেষে তাকে তার নিজের নিরাপদ বিছানায় শুইয়ে দিন। নিরাপদ ঘুম নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন নবজাতকের নিরাপদ ঘুমের নিয়ম লেখায়।
একটা সতর্কতা: শিশু স্লিং বা ক্যারিয়ারে থাকা অবস্থায় বুকের দুধ খাওয়াবেন না, আগে বের করে নিন।
কতক্ষণ পরপর খাওয়াবেন
নবজাতক প্রথম কয়েক সপ্তাহ ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮ থেকে ১২ বার খায়, কখনো ১ থেকে ৩ ঘণ্টা পরপর, রাতেও (CDC)। মুখে হাত দেওয়া, মাথা এদিক-ওদিক ঘোরানো বা ঠোঁট চোষা হলো খিদের প্রথম দিকের লক্ষণ। কান্না শুরুর আগেই খাওয়ালে লাচ সহজ হয়।
এক পাশে শিশু নিজে থেকে ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত খেতে দিন, তারপর অন্য পাশ সাধাতে পারেন।
বাংলাদেশের প্রচণ্ড গরমেও বুকের দুধ খাওয়া শিশুর আলাদা পানি লাগে না। গরমে সে হয়তো একটু ঘন ঘন খেতে চাইবে, তখন বারবার খাওয়ান (NHS)। মা নিজে যেন পর্যাপ্ত পানি খান, সে জন্য পাশে একটা বোতল রাখুন।
শিশু যথেষ্ট দুধ পাচ্ছে কি না: লক্ষণ
খাওয়ার সময় ঢোক গেলার শব্দ শোনা যায়, আর খাওয়ার পর শিশুকে তৃপ্ত দেখায়। প্রথম সপ্তাহে সামান্য ওজন কমা স্বাভাবিক, তবে ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে জন্মের ওজনে ফিরে আসার কথা। প্রথম সপ্তাহে দিনে অন্তত এতগুলো ডায়াপার আশা করা যায় (CDC):
| বয়স | ভেজা ডায়াপার | পায়খানা |
|---|---|---|
| ১ম দিন | ১ | ১ |
| ২য় দিন | ২ | ৩ |
| ৩য় দিন | ৫ | ৩ |
| ৪র্থ থেকে ৭ম দিন | ৬ | ৩ |
ডায়াপার গুনতে সুবিধা হয় যদি প্রতিবার বদলানোর সময় মোবাইলে টুকে রাখেন। বারবার বদলানোর জন্য Fresh Happy Nappy বেবি ওয়াইপস ১২০ পিস হাতের কাছে রাখতে পারেন। খাওয়ানোর পর মুখ ও থুতনি মুছতে নরম কাপড়ও কাজে লাগে, যেমন Gerber 8 Pack Baby Washcloth।
যে ভুলগুলো এড়াবেন
- স্তন শিশুর মুখে ঠেলে দেওয়া, শিশুকে স্তনের কাছে না আনা।
- প্রথম ছয় মাসে পানি, মধু বা চিনির পানি দেওয়া।
- শুরুর দিকে ফিডার বা চুষনি দেওয়া, যা WHO এড়াতে বলে।
- ব্যথা হলেও চুপচাপ সহ্য করে যাওয়া। ব্যথা মানে প্রায়ই লাচ ঠিক হয়নি।
- নিজের খাওয়া ও বিশ্রাম ভুলে যাওয়া।
বাইরে গেলে মায়ের পানির বোতল আর শিশুর জিনিস একসঙ্গে রাখতে মাদার ব্যাগ / ডায়াপার ব্যাকপ্যাক সুবিধাজনক, এতে ইনসুলেটেড বোতল পকেট আছে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন: শিশু ২৪ ঘণ্টায় ৮ বারের কম খেলে, পঞ্চম দিনের পরও ওজন কমতে থাকলে, ডায়াপার প্রায় শুকনো থাকলে, ত্বক হলদে দেখালে, কিংবা বোঁটা ফেটে রক্ত পড়লে দেরি না করে ডাক্তার বা ল্যাকটেশন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সাধারণ প্রশ্ন
বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় ব্যথা হওয়া কি স্বাভাবিক?
শুরুর কয়েক দিন হালকা অস্বস্তি হতে পারে, তবে পুরো সময় ধরে ব্যথা স্বাভাবিক নয়। সাধারণত লাচ ঠিক করলে ব্যথা কমে, না কমলে স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নিন।
গরমে কি নবজাতককে পানি খাওয়াতে হবে?
না, শুধু বুকের দুধ খাওয়া শিশুর ছয় মাস বয়স পর্যন্ত আলাদা পানি লাগে না। গরমে বারবার বুকের দুধ খাওয়ালেই চলে।
কীভাবে বুঝব আমার বুকে দুধ কম?
শুধু শিশুর কান্না বা স্তন নরম লাগা দেখে দুধ কম ধরে নেবেন না। ভেজা ডায়াপারের সংখ্যা, ওজন বাড়া আর খাওয়ার পর শিশুর তৃপ্ত ভাব, এই তিনটিই ভালো মাপকাঠি।
নবজাতকের প্রয়োজনীয় জিনিস এক জায়গায় পেতে দেখুন আমাদের ০–১২ মাসের কালেকশন।
