
শিশুর পেটে গ্যাস হলে সবচেয়ে কাজের উপায় হলো খাওয়ানোর সময় শিশুকে একটু খাড়া করে ধরা, খাওয়ার মাঝে বা পরে ঢেকুর তোলানো, আর চিত করে শুইয়ে পা দুটো সাইকেল চালানোর মতো আলতো নাড়ানো। বেশিরভাগ গ্যাসের অস্বস্তি এতেই কমে আসে। তবে শিশু যদি দিনের পর দিন অনেকক্ষণ ধরে থামানো যায় না এমন কান্না করে, সেটা কলিক হতে পারে।
সন্ধ্যা নামলেই শিশু পা গুটিয়ে, মুঠি শক্ত করে, মুখ লাল করে কাঁদছে। কোলে নিলেও থামছে না। নতুন মা-বাবার কাছে এর চেয়ে কষ্টের দৃশ্য কম আছে। চলুন বুঝে নিই গ্যাস আর কলিক কী, কী করলে আরাম মেলে, আর কোন লক্ষণে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যাবেন।
শিশুর পেটে গ্যাস কেন হয়
খাওয়ার সময় দুধের সঙ্গে শিশু কিছু বাতাসও গিলে ফেলে। বিশেষ করে তাড়াহুড়ো করে খেলে, ফিডারের নিপলের ছিদ্র বেশি বড় বা ছোট হলে, বা খুব কান্নার পর খেতে বসলে বেশি বাতাস ঢোকে। এই বাতাস পেটে আটকে থাকলে শিশু অস্বস্তিতে কাঁদে।
NHS বলে, পেটে বাতাস আটকে থাকার লক্ষণ হলো কান্না, পিঠ বাঁকিয়ে ফেলা, পা পেটের দিকে টেনে আনা আর মুঠি শক্ত করা (NHS)।
ঢেকুর তোলানোর তিনটি সহজ পদ্ধতি
ঢেকুর কখন তোলাবেন তার কোনো বাঁধা নিয়ম নেই। কোনো শিশুর খাওয়ার মাঝখানে লাগে, কারো পরে। শিশু অস্বস্তি দেখালে থেমে ঢেকুর তোলান, আর আরামে থাকলে খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সাধারণত দুই-এক মিনিটই যথেষ্ট। NHS এই তিনটি অবস্থানের কথা বলে (NHS):
- কাঁধের উপর: শিশুর থুতনি আপনার কাঁধে রাখুন, এক হাতে মাথা ও কাঁধ ধরে অন্য হাতে পিঠে আলতো ঘষুন বা চাপড় দিন। হাঁটাহাঁটি করলে আরও কাজ দেয়।
- কোলে বসিয়ে: শিশুকে আপনার কোলে সামনের দিকে মুখ করে বসান। এক হাত বুকে রেখে থুতনি ও চোয়াল ধরুন, একটু সামনে ঝুঁকিয়ে অন্য হাতে পিঠ চাপড়ান।
- কোলে উপুড় করে: শিশুকে আপনার উরুর উপর উপুড় করে শোয়ান, থুতনি ধরে রেখে পিঠে আলতো ঘষুন।
খেয়াল রাখবেন, মাথা আর ঘাড় যেন সবসময় ধরা থাকে, পিঠ সোজা থাকে আর গলায় কোনো চাপ না পড়ে।
খাওয়ানোর সময় যা খেয়াল রাখবেন
- খাওয়ানোর সময় শিশুকে শুইয়ে না রেখে একটু খাড়া করে ধরুন। NHS বলে, এতে কম বাতাস গিলে (NHS)।
- শিশু খুব ক্ষুধার্ত হয়ে জোরে কান্না শুরুর আগেই খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।
- ফিডারে খাওয়ালে বোতল এমনভাবে ধরুন যেন নিপল সবসময় দুধে ভরা থাকে।
- বেশি খাইয়ে ফেলবেন না। AAP এক খাওয়া শুরু থেকে পরেরটা পর্যন্ত মোটামুটি দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় রাখার কথা বলে (AAP)।
- বুকের দুধ খাওয়ালে স্বাভাবিকভাবে খাওয়ানো চালিয়ে যান। NHS বলে, কলিকের জন্য মায়ের খাবার বদলানোর সাধারণত দরকার নেই।
ছোট পরিমাণে খাওয়ানোর জন্য অনেকে ৬০ মি.লি বেবি ফিডার ব্যবহার করেন। ফিডার ব্যবহার করলে প্রতিবার ভালো করে পরিষ্কার করা জরুরি, এজন্য একটা ফিডার ক্লিনিং ব্রাশ কাজে আসে। পরিষ্কারের পুরো নিয়ম দেখুন আমাদের ফিডার পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার গাইডে।
পেট মালিশ ও পায়ের ব্যায়াম
ঢেকুর না উঠলে NHS পরামর্শ দেয় শিশুকে চিত করে শুইয়ে পেটে আলতো মালিশ করতে আর পা দুটো সাইকেল চালানোর মতো নাড়াতে।
- আঙুলের ডগা দিয়ে নাভির চারপাশে ঘড়ির কাঁটার দিকে খুব আলতো করে গোল গোল ঘোরান।
- দুই পা ধরে হাঁটু ধীরে পেটের দিকে আনুন, আবার সোজা করুন।
- খাওয়ার পরপরই নয়, একটু সময় দিয়ে তারপর করুন।
- শিশু কাঁদলে বা অস্বস্তি দেখালে থেমে যান।
কলিক আসলে কী
কলিক মানে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই সুস্থ শিশুর অনেক বেশি কান্না। NHS-এর বর্ণনা অনুযায়ী, দিনে তিন ঘণ্টার বেশি, সপ্তাহে তিন দিন বা তার বেশি, অন্তত এক সপ্তাহ ধরে এমন কান্না হলে তাকে কলিক বলা হয়। কান্না প্রায়ই বিকেল আর সন্ধ্যায় বাড়ে (NHS)।
AAP জানায়, কলিক সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ বয়সে শুরু হয় আর তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কমে যায়, কারো কারো ছয় মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। এর সঠিক কারণ জানা নেই।
কলিকে শিশুকে শান্ত করার উপায়
- শিশুকে কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরুন, আলতো দোলান।
- কোলে নিয়ে হাঁটুন। AAP বলে, ক্যারিয়ারে নিয়ে হাঁটলে নড়াচড়া আর শরীরের স্পর্শে শিশু আশ্বস্ত হয়। চাইলে বেবি ক্যারিয়ার ব্যাগ ব্যবহার করতে পারেন, তবে আগে পড়ে নিন বেবি ক্যারিয়ার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম।
- ফ্যানের একটানা শব্দের মতো হালকা হোয়াইট নয়েজ চালু রাখুন।
- কুসুম গরম পানিতে গোসল অনেক সময় শান্ত করে।
NHS জানায়, অ্যান্টি-কলিক ড্রপ, ভেষজ বা প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট কাজ করে এমন প্রমাণ নেই, তাই এগুলো সুপারিশ করা হয় না। গ্রাইপ ওয়াটার বা যেকোনো ড্রপ দেওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
মনে রাখুন: ক্লান্ত লাগলে শিশুকে চিত করে নিরাপদ বিছানায় শুইয়ে কয়েক মিনিটের জন্য সরে যাওয়া ঠিক আছে, কিন্তু কখনো শিশুকে ঝাঁকাবেন না। AAP সতর্ক করে, ঝাঁকুনিতে শিশুর মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
NHS ও AAP অনুযায়ী এই লক্ষণগুলোতে দেরি করবেন না:
- শিশুর কান্না দুর্বল বা অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ শোনালে, বা স্বাভাবিক কান্নার মতো না লাগলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি বিভাগে যান।
- কোনো উপায়েই কান্না না থামলে।
- শিশুর ওজন ঠিকমতো না বাড়লে বা বাড়ছে না মনে হলে।
- চার মাস পার হওয়ার পরও কান্না একইরকম থাকলে।
- আপনি নিজে আর সামলাতে পারছেন না বা মন খারাপ লাগছে মনে হলে।
সাধারণ প্রশ্ন
নবজাতকের পেটে গ্যাস হলে কীভাবে বুঝবো?
শিশু কান্না করে, পিঠ বাঁকিয়ে ফেলে, পা পেটের দিকে গুটিয়ে আনে আর মুঠি শক্ত করে রাখে। ঢেকুর তোলানো বা পেটে আলতো মালিশের পর আরাম পেলে সেটা সাধারণত গ্যাসের অস্বস্তি।
শিশুর কলিক কত মাস পর্যন্ত থাকে?
কলিক সাধারণত কয়েক সপ্তাহ বয়সে শুরু হয়ে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কমে যায়। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ছয় মাস পর্যন্ত থাকতে পারে, চার মাসের পরও না কমলে ডাক্তার দেখান।
শিশুর গ্যাসের জন্য গ্রাইপ ওয়াটার দেওয়া কি ঠিক?
NHS জানায়, অ্যান্টি-কলিক ড্রপ বা ভেষজ সাপ্লিমেন্ট কাজ করে এমন প্রমাণ নেই। নিজে থেকে কিছু না দিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
শিশুকে খাওয়ানোর প্রয়োজনীয় জিনিস দেখুন আমাদের ফিডিং কালেকশনে।
